বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় বাংলাদেশ রুরাল মেডিকেল প্র্যাকটিশনার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি (বিআরএমপি)’র পল্লী চিকিৎসক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাঁশখালীর মেডিকেয়ার হাসপাতাল আয়োজিত এ সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
তার বক্তব্যে তিনি পল্লী চিকিৎসকদের ভূয়সী প্রশংসার পাশাপাশি তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা জানান। তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে শতাধিক এলএমএএফের উপস্থিতিতে বেসরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করা এক চিকিৎসক এজিএন (একিউট গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস)-এর রোগীর প্রথমে কী দেখতে হয় তা পারেননি বলে নেতিবাচক মন্তব্য করেন!
বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারী) দুপুরে উপজেলার বৈলছড়ি এস.কেবি কনভেনশন হলরুমে বিআরএমপি বাঁশখালী উপজেলা শাখার উদ্যোগে এই পল্লী চিকিৎসক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশিক্ষণের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বেসরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করা এক চিকিৎসক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমি একটা উদাহরণ দিয়ে বলি, লাস্ট একজন ডাক্তারের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আসছে। উনি এমবিবিএস ডক্টর, উনি পাঁচ থেকে ছয়টা চেম্বার করেন। উনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, আমরা তাকে ডাকলাম। ডাকার পর তাকে আমরা চা অফার করলাম।
তাকে বললাম – ভাই, তোমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ, তুমি এগুলো একটু চেষ্টা কর সংশোধন হতে।
সে বলল – আমি কম পয়সায় রোগী দেখি এজন্য আমার বিরুদ্ধে অনেক বেশি।
আমরা ডাক্তার তিনজন ছিলাম, তাকে বললাম আমি, ভাই একটা এজিএন এর প্যাশেন্ট যদি আসে, পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা এজিএন এর প্যাশেন্ট আসলে তুমি প্রথমে কী দেখবা?
সে অনেক উত্তর দেয়। আসল কথা বলতে পারে না। আমরা বলি যে, হয় নাই। একটা এজিএন এর প্যাশেন্ট আসলে তাকে যে প্রেশার দেখতে হবে, সে জিনিসটা জানে না।
সে বেসরকারি একটা মেডিকেল থেকে পাশ করেছে।
একথাটা আমি কেন বললাম? এজন্য বললাম – আমরা ডাক্তার হয়েছি পাঁচ বছর, সেশন জটের কারণে সাত বছর পড়াশোনা করেছি। তারপরে চট্টগ্রাম মেডিকেলে তিন থেকে পাঁচবছর আমরা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। আমাদের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। প্র্যাকটিক্যালগুলো আমাদের জানা আছে। আপনাদের সেটা জানা নাই। সুতরাং, আপনাদের বাড়াবাড়ি করার কোন সুযোগ নাই।
তো এই ডক্টরকে বললাম, সে বেসরকারি মেডিকেল থেকে পাশ করেছে কিন্তু তার অভিজ্ঞতাটুকু নাই। তাহলে কী করতে হবে? প্রশিক্ষণ নিতে হবে। যতবেশি প্রশিক্ষণ নিবে ওত বেশি আমরা জ্ঞান সমৃদ্ধ হব।’
সম্মেলনে সিভিল সার্জনকে অতিথি করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি পল্লী চিকিৎসকদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের প্রতি আবারও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আপনারা আমাকে দাওয়াত দেয়ার জন্য। যে কোন প্রয়োজনে, যে কোন কাজে আপনারা আমাদের সাহায্য নিবেন এবং আপনাদের জীবন গঠনে আমাদের রোগীদের সেবায় আপনারা আরো বেশি প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য চেষ্টা করে যাবেন।
আমি চেষ্টা করে যাব আপনাদের যে কোন জায়গায়, যে কোন স্থানে আপনারা যদি চান আমি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিব ইন শা আল্লাহ। আমরা আমাদের এখানে প্রত্যেকটি উপজেলায় যেমন – ল্যাবের মানুষসল্পতা আছে। আমরা কিছু মানুষকে আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেলে একমাস, দুইমাস করে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে ওদেরকে দক্ষ করে তুলব।
আপনারা যারা ইসিজি করেন, কার্ডিওগ্রাফার আছেন, ওনারা অনেক সময় এক্সপার্ট থাকেন না। আপনাদেরকে চট্টগ্রাম মেডিকেলে প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য আসবেন।
ডক্টর (এলএমএএফ) যারা আল্ট্রাসনোগ্রাম শিখতে চান, ১০ দিনে প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার জন্য আমরা চট্টগ্রাম মেডিকেলে রিকোয়েস্ট করি। আমরা চাচ্ছি, এই সময়েই আমরা চাচ্ছি, একটাই কথা আমরা দক্ষ হয়ে উঠব। যে যেখানে আছি, যে যেখানে আমরা সেবা করি গ্রামেগঞ্জে আমরা গতানুগতিক থাকব না, আমরা। আমরা একটু পরিবর্তন হব, আমরা দেশ গঠনে একটু সুন্দর ভূমিকা রাখব।
আমাকে কষ্ট করে দাওয়াত দেয়ার জন্য, আজকের প্রোগ্রামে যারা উপস্থিত হয়েছেন সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি এবং আমার কথা যদি কাজে লাগে আপনাদের, সেটাই আমার স্বার্থক। সবাইকে ধন্যবাদ।’
সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পল্লী চিকিৎসকদের ভূয়সী প্রশংসা করে সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘পল্লী চিকিৎসকরা আমাদের দেশের সম্পদ। পল্লী চিকিৎসকরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন সেবা দিয়ে রোগীদের সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। গ্রামের একজন মানুষ অসুস্থ হলে প্রথম ডাক্তারি সেবা পল্লী চিকিৎসকরাই দেন। প্রাথমিক চিকিৎসায় বহু রোগী মৃত্যুর কোল থেকে ফিরে আসে। এই অবদান অস্বীকার করার কিছুই নেই। পল্লী চিকিৎসকদের আরও প্রশিক্ষণ দরকার। পল্লী চিকিৎসকরা আছেন বলেই দেশের দূর্গম অঞ্চলের মানুষরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন।আপনাদের মাধ্যমে দেশ ও সরকার যে উপকৃত হচ্ছে সেটা অনস্বীকার্য। সেজন্য আমি আমার পক্ষ থেকে আপনাদেরকে মোবারকবাদ জানাচ্ছি।’
ধাত্রীদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে বাঁশখালীর ইউএইচএফপিওকে নির্দেশ দিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি আমাদের যোগদান করার পর আমি বাঁশখালীর ইউএইচএফপিও মহোদয়কে বলেছি যত ধরনের ধাত্রী আছে, যারা গর্ভবতী মহিলাদের ডেলিভারি করায় ওনাদেরকে একটা প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য। কারণ, আমাদের পাশে দেখি আমরা যখন প্র্যাকটিস করি এমন অনেক বাচ্চা আসে যারা সেরেব্রাল পালসি বা প্রতিবন্ধী হয়ে যায়। যে বাচ্চাগুলো বসতে পারে না। যে বাচ্চা গুলো… স্যার ভালো বলতে পারবেন।
কেন বসতে পারে না? ডেলিভারি হওয়ার পরে, বাচ্চার জন্মের পরপরই বাচ্চাগুলোকে মায়ের পেটের যে ময়লাগুলো বের করতে হয় অক্সিজেন দেয়া লাগে।
সেটা বাসায় কী দেয়া সম্ভব? সম্ভব না। এ কথাটুকু আমরা কাকে বলব? কাকে বুঝায়ে বলব? কিন্তু ধাত্রীরা অহরহ ডেলিভারি করে যাচ্ছে! কী হচ্ছে? ১০০ জনের মধ্যে ৫ জন প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে। যার বাসায় একটা প্রতিবন্ধী আছে সে বুঝতে পারে তার এই কষ্টটুকু কী! আমি বলেছি আমাদের ইউএইচএফপিও মহোদয় নাজমাকে বলেছি, আপনি সকল ধাত্রীকে ডাকেন, প্রশিক্ষণ দেন। বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ দেন, দুইদিনের প্রশিক্ষণ দেন। অন্ততপক্ষে ডেলিভারি করার সময় যাতে ওরা হোম ডেলিভারি না করে। একটা প্রতিষ্ঠান ডেলিভারি করুক।
যেখানে একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকবে অক্সিজেন থাকবে, সাকার মেশিন থাকবে এবং জীবন রক্ষাকারী কিছু ড্রাগ মায়ের জন্য এবং বাচ্চার জন্য থাকবে। সুতরাং আমি আজকে আহবান জানাব আপনারা যারা গ্রামে গঞ্জে চিকিৎসা করেন, জনগণের সেবা করেন আপনারা আরো বেশি জ্ঞান অর্জন করার চেষ্টা করবেন। এবং আপনাদের যতটুকু জ্ঞান আছে, সেই জ্ঞানকে আপনারা সমৃদ্ধ করার জন্য আপনারা চেষ্টা করে যাবেন।’
জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বলি, কেন জ্ঞান দরকার? একজন ভদ্রলোক এইচআইভি এইডস হয়েছে। সে তথ্য গোপন করেছে। তথ্য গোপন করে সে নোয়াখালীতে গিয়ে অপারেশন করে ফেলেছে। কী করেছে সে? গলব্লাডার অপারেশন করে ফেলেছে। সে বলে নাই। তাহলে কী হইল?আল্টিমেট রেজাল্টটা কী হল? সে নোয়াখালীর ওটিতে এইচআইভি ভাইরাসকে ছড়ায়ে দিল, এরপর যত ওটি হবে, তারা যেহেতু জানে না, তারা ডিসইনফেক্টেড না করে ওই এলাকায় সব ভাইরাস চলে যাবে। সুতরাং এই যে আমরা সেলাই করি, স্টিচ দেই, একজনকে দেয়ার পরে সেটা আর কাউকে দেয়া যাবে না। যদি হেপাটাইটিস ভাইরাস থাকে, বি ভাইরাস থাকে সি ভাইরাস থাকে, আমাদের কাছে তথ্য গোপন করে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা চাই আমরা যে পরিবর্তনের সুর দেশে বিরাজ করতেছে এই পরিবর্তনটাকে আমরা ধারণ করে, আমরা নিজেকে পরিবর্তন করব, আমরা বেশি বেশি জ্ঞানার্জন করব এবং চিকিৎসা পেশাকে যাতে একটা রোল মডেল করা যায় আমরা সবাই মিলে আমরা এগিয়ে আসব।
আমাদের সম্মানিত ডা. ফারুক ভাই আমাকে একটা পরামর্শ দিয়েছেন, এটা আমি নিজে থেকেও ফিল করেছি গতপরশুদিন আমাদের চট্টগ্রাম শহরে আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্য সচিব মহোদয় আসছেন। ডা. সায়েদুর রহমান স্যার আসছিলেন। আমরা ধর্ম উপদেষ্টা মহোদয়ের বাড়িতে একটা হেল্থ ক্যাম্প করেছি। ফাইভ থাউজ্যান্ড প্যাশেন্ট দেখেছি আমরা, ৭০ জন ডাক্তার দিয়ে চট্টগ্রাম থেকে। স্যার দেখলাম, সচিব মহোদয় উনি আসছেন ওখানে পরিদর্শন করতে। সুতরাং কিন্তু আমি বিকেলে দেখলাম স্যারের যে নেটওয়ার্ক ; নাটোরের যত মানুষ আছে, সবগুলো স্যারের আয়ত্তের মধ্যে। উনি বিকেলে দুই-তিনটা প্রোগ্রাম করলেন নাটোরবাসীদের নিয়ে। এই নাটোরের যত মানুষ আছে, উনারা সব একতাবদ্ধ। উনারা এখানে স্কলারশিপ দেন, যেকোনো মানুষকে বিপদে পড়লে চট্টগ্রাম শহরে উনারা ভর্তির ব্যাপারে হোক যে কোন প্রয়োজনে – চাকরি, ইউনিভার্সিটিতে পড়ে, যার টিউশনির দরকার তাকে টিউশনির ব্যবস্থা করে দেয়া, যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো কাজে ওনারা অর্গানাইজড। আমরাও চেষ্টা করি, চেষ্টা করব এই স্বাস্থ্যখাতে আমরা চট্টগ্রাম, আমরা বাঁশখালীর যে প্রায় সাত লক্ষ মানুষ আছেন আমাদের, আমরা সবাই মিলে যদি একটা প্ল্যাটফর্মে আমরা দাঁড়াতে পারি, আমাদের শ্রদ্ধেয় বড়ভাই ফারুক ভাইকে নিয়ে আমাদের উদীয়মান ডক্টর আসিফ সবাইকে নিয়ে আমরা দাঁড়াতে পারি, আমরা স্বাস্থ্যখাতে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারব।’
এ সময় পল্লী চিকিৎসক সম্মেলনে বিআরএমপি বাঁশখালী উপজেলার সাধারণ সম্পাদক এস.এন রাসেলের সঞ্চালনায় (ব্যানারে পল্লী চিকিৎসক হবার পরেও নামের আগে ডা. উল্লেখ করা হয়েছে) সভাপতি আশেক এলাহী রনির সভাপতিত্বে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ চিকিৎসক ডা. ফররুখ আহমদ ফারুক, উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিআরএমপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব আইয়াজ সিকদার, বিশেষ অতিথি ছিলেন ডা. আসিফুল হক, ডা. হামিদা আকতার প্রমুখ। এ সময় বাঁশখালী উপজেলার শতাধিক এলএমএএফ উপস্থিত ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত তার বক্তব্যের লাইভ ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
প্ল্যাটফর্ম/এমইউএএস